প্রশ্ন : সংস্কৃত-প্রাকৃত-অপভ্রংশে রচিত বাঙালির সাহিত্যকর্মগুলির পরিচয় দিন।

উত্তর : ভারতের প্রাচীনতম ভাষা সংস্কৃত ভাষা। এই সংস্কৃত ভাষার জঠর থেকেই আধুনিক ভারতীয় সাহিত্যের জন্ম। শুধু বাংলা নয়, দক্ষিণ ভারতীয় তামিল, তেলেগু, কন্নড় প্রভৃতি ভাষাসমূহের উৎস এই ভাষা থেকেই। তাই বাংলা সাহিত্যের আলোচনার পূর্বে বাংলাদেশে রচিত সংস্কৃত-প্রাকৃত-অপভ্রংশ ভাষার কথা অনায়াসে এসে পড়ে। খ্রীস্টীয় দশম শতাব্দী বা তার অল্প কিছু আগে মাগধী অপভ্রংশের খোলস ত্যাগ করে বাংলা ভাষার জন্ম হয়। কিন্তু এই বাংলা সাহিত্যের উৎপত্তির পূর্বেও বাঙালি সাহিত্য চৰ্চা করেছে— তা হল সংস্কৃত-প্রাকৃত-অপভ্রংশ সাহিত্য।

মৌর্য যুগেই বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য আর্যসংযোগ ঘটে বলে পন্ডিতেরা মনে করেন। কিন্তু এ যুগেও বাঙালির সাহিত্য সাধনার কোন পরিচয় পাওয়া যায় না। এরপর বাঙালিরা অল্পকালের মধ্যেই সংস্কৃত ভাষা আয়ত্ত করে ব্যাকরণ, তর্কশাস্ত্র এবং দর্শন বিষয়ক গ্রন্থ রচনায় খ্যাতি অর্জন করে। গদ্যে বাণভট্ট ও কাব্যে কালিদাসের অনুসরণ লক্ষ্য করা যায়। এই সময় বাঙালিদের সাহিত্য রচনার মধ্যে দিয়ে অলঙ্কারবহুল এক আড়ম্বরপূর্ণ পল্লবিত রীতির অবলম্বন চোখে পড়ে। নিম্নে আমরা বাঙালির রচিত বিভিন্ন সংস্কৃত-প্রাকৃত-অপভ্রংশ সাহিত্যগুলি সূত্রাকারে বর্ণনা করব—

ক) প্রশস্তিকাব্য : বাংলাদেশে শিষ্ট সাহিত্য সৃষ্টির ইতিহাস শুরু হয়েছে এই প্রশস্তি কাব্য থেকে। এ প্রসঙ্গে নারায়ণ পালের মন্ত্রীভট্ট, গুরবমিশ্রের প্রশস্তিকাব্য, কবি মনোরথের মহামন্ত্রী, বৈদ্যদেবের প্রশস্তি কাব্য, কবি বাচস্পতির মন্ত্রী ভট্ট, ভবদেবের প্রশস্তিকাব্য, উমাপতি ধরের নৃপতি বিজয়দেবের প্রশস্তিকাব্য প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। তবে এগুলির মধ্যে মহাকাব্যসুলভ শৃঙ্গার রসের উৎসার ঘটেছে। সংস্কৃত সাহিত্য জগতে এগুলির মৌলিক কোন ভূমিকা না থাকলেও বাঙালি কাব্যরচনাতে এগুলির গুরুত্ব যে কম নয় তার প্রমাণ দেয়।

খ) সংস্কৃত সাহিত্য চর্চা : বাংলা ভাষা জন্মাবার আগেই এদেশের কবি-পন্ডিতেরা সংস্কৃতে সাহিত্যচর্চা করতেন। এগুলিকে বড় কাব্য, নাটক ও প্রকীর্ণ শ্লোকের পর্যাভুক্ত করা যায়। এ প্রসঙ্গে পাল রাজাদের দু’জন বিশিষ্ট সভাকবি অভিনন্দ ও সন্ধ্যাকর নন্দী সংস্কৃতে রামায়ণ রচনা লিখেছিলেন। অভিনন্দ রচিত ‘রামচরিতে’র মূল বৈশিষ্ট্য হল হনুমানের মুখে গোমাহাত্ম্য কীর্তন। আর সন্ধ্যাকর নন্দীর ‘রামচরিত’-এ কলাকুশলতার বিশিষ্ট পরিচয় মেলে। একদিকে তিনি যেমন রামায়ণের কাহিনি ব্যক্ত করেছেন, তেমনি সভাকবি মানসিকতায় পৃষ্ঠপোষক রাজা রামপালদেব প্রমুখের বীরমাহাত্ম্য প্রচার করেছেন। এছাড়া আলঙ্কারবাহুল্যে ভরপুর ‘কীচকবধ’ কাব্যের লেখক নীতিবর্মা ও ‘নৈষধচরিতে’-র রচয়িতা শ্রীহর্ষকেও গবেষকরা বাঙালি কবি হিসাবে স্বীকৃতি দেয়। আবার সেকালে বাংলাদেশে সংস্কৃত ভাষায় অনেক নাটক রচিত হয়েছিল। রামায়ণ-মহাভারত প্রভৃতি পৌরাণিক বিষয় অবলম্বনে সেগুলি রচিত হয়েছিল। তবে ঐতিহাসিক ও কাল্পনিক বিষয় অবলম্বনে কিছু সংস্কৃত নাটকের সন্ধান পাওয়া যায়। সেগুলি হল— ক্ষেমীশ্বরের ‘চন্ডকৌশিক’, ভট্টনারায়ণের ‘বেণীসংহার’, মুরারি মিশ্রের ‘অনর্ঘরাঘব’ প্রভৃতি।

গ) সংকলন গ্রন্থ : মহাকাব্যের শব্দ, শ্লোকের অরণ্যে যা ছিল পথহারা, ছোট ছোট উদ্ভট শ্লোকের মধ্যে বাঙালি কবিরা যেন তাঁদের হৃদয়ের গতিপথ খুঁজে পেয়েছিলেন। সাহিত্যে বাঙালির এই প্রগতিপরায়ণতা একাদশ-দ্বাদশ শতাব্দীর পূর্বেই প্রকট হয়েছিল। তাই এই সময়ে ছোট ছোট সংস্কৃত কবিতা বা প্রাচীন শ্লোকের অপভ্রংশ অবহট্ঠ পদ রচনাকে কেন্দ্র করে কতকগুলি সংকলন গ্রন্থের সন্ধান পাওয়া যায়। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল—

১) কবীন্দ্রবচনসমুচ্চয় : সংস্কৃত কবিতার প্রাচীনতম সংকলন ‘কবীন্দ্রবচনসমুচ্চয়’ একাদশ-দ্বাদশ শতকের প্রত্নবঙ্গলিপিতে লিখিত হয়েছিল। সংকলকের কোন নাম পাওয়া যায় নি। গ্রন্থটিতে ১১১জন কবির ৫২৫টি পদ সংকলিত হয়েছে। তবে এর সবগুলিই বাঙালির রচিত নয়, সর্বভারতীয় কবিদের পদও গ্রন্থটিতে স্থান পেয়েছে। ‘কবীন্দ্রবচনসমুচ্চয়’ গ্রন্থটির গুরুত্ব হল, পরবর্তীকালে লক্ষণ সেনের রাজসভায় জয়দেব, গোবর্ধন প্রমুখ কবিদের রচনায়, যে আদিরসাত্মক ভক্তিবাদের ধারা প্রবাহিত হয়, সেই কেলিবিলাস কলার উৎস এই গ্রন্থের রাধা-কৃষ্ণ বিষয়ক শ্লোকের মধ্যে নিহিত। বাঙালি বলে অনুমিত কবিদের মধ্যে আছেন শ্রীধর নন্দী, গৌড় অভিনন্দন, বিনয়দেব ধর্মকর, বুদ্ধাকর গুপ্ত, রতিপাল প্রমুখ।

২) সদুক্তিকর্ণামৃত : বাংলাদেশে সংকলিত একটি জনপ্রিয় চয়নিকা হল ‘সদুক্তিকর্ণামৃত’। এই চয়নিকার সংকলক হলেন শ্রীধরদাস। আলোচ্য সংকলন গ্রন্থটি পাঁচটি প্রবাহ এবং এক একটি প্রবাহে কয়েকটি বীচি এবং প্রত্যেক বীচি-তে পাঁচটি করে কবিতা সংগৃহীত হয়েছে। কবিতার সংখ্যা ২৩৭০টি এবং মোট কবির সংখ্যা ৪৮৫জন। এতে অজ্ঞাত পরিচয় ৮০জন কবি ছাড়া কালিদাস, ভাস, ভামহ, ভর্তৃহরি, উমাপতিধর, জয়দেব প্রভৃতি বাঙালি কবিদের শ্লোক স্থান পেয়েছে। তবে বাঙালি রচিত হর-পার্বতী, ও রাধা-কৃষ্ণ বিষয়ক কয়েকটি শ্লোক পরবর্তীকালের বাংলা সাহিত্যের সূচনা করেছে।

৩) গাথাসপ্তশতী : প্রাকৃত কবিতাসংগ্রহ হিসাবে মহাকবি হালের ‘গাথাসপ্তশতী’ নানা কারণে উল্লেখযোগ্য। দক্ষিণ ভারতের সাতবাহন বংশের হাল নামক কোন এক রাজা এই শ্লোকগুলি মহারাষ্ট্রী প্রাকৃতে রচনা করেছিলেন। সন তারিখ নিয়ে ‘গাথাসপ্তশতী’-র প্রামাণিকতা সম্পর্কে কিছু মতান্তর থাকলেও এই কাব্যটি লোকজীবনের উজ্জ্বল চিত্র হিসাবে প্রাচীনকাল থেকেই বিশেষ প্রশংসা পেয়ে আসছে। এই সংকলন গ্রন্থেই প্রথম রাধার প্রসঙ্গ পাওয়া যায়।

৪) প্রাকৃতপৈঙ্গল : ভাব, বিষয়বস্তু ও ভাষা-কৌশলের দিক থেকে এই গ্রন্থটি বাঙালি জীবন ও সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অপভ্রংশ-অবহট্‌ঠে রচিত আলোচ্য গ্রন্থটি চতুর্দশ শতকে সংকলিত হয়েছিল। নবম-দশম শতকে রচিত অনেক পদ এতে স্থান পেয়েছে। সঙ্কলকের নাম পিঙ্গল। এই গ্রন্থেও রাধাকৃষ্ণ ও গোপীলীলার উল্লেখ আছে, আছে বিভিন্ন দেবদেবীর সঙ্গে ‘রাঈ’-এর উল্লেখ এবং শিবের প্রসঙ্গ, আর বাঙালির জীবনভোগের স্বাদু সংবাদ—

“ওগগর ভক্তা রম্ভঅ পত্তা।

গায়িক ঘিত্তা দুগ্ধ সজুত্তা।।

মৌইণি মচ্ছা নালিচ গচ্ছা।

দিজ্জই কন্তা খাই পুণ্যবত্তা।।”

—বাঙালি জাতির এই রসনার ছবি বর্ণনায় পরবর্তী কবিরাও উৎসাহিত। মধ্যযুগের কবি মুকুন্দরাম থেকে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত সে সুযোগ সানন্দে গ্রহণ করেছে।

ঘ) জয়দেব ও গীতগোবিন্দ : লক্ষণসেনের রাজসভায় পঞ্চরত্নের শ্রেষ্ঠ রত্ন জয়দেব সংস্কৃত ভাষার কবি। তাঁর রচিত ‘গীতগোবিন্দ’ আসলে গীতিনাট্য। এর পাত্র-পাত্রী তিনজন রাধা, কৃষ্ণ ও বড়াই। শ্রীকৃষ্ণ বসন্ত পূর্ণিমায় বহু গোপীদের সঙ্গে রাসলীলা করায় রাধা মানিনী হলে কৃষ্ণ তার মানভঞ্জন করেন— এই হল কবিতার মূল বিষয়। ‘গীতগোবিন্দে’র এই বিষয়বস্তু ও উপস্থাপনার কৌশল ‘শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন’ কাব্যে প্রত্যক্ষভাবে এসেছে। এখানেও পাত্র-পাত্রী তিনজন— রাধা, কৃষ্ণ ও বড়াই। তাছাড়া বৈষ্ণব পদাবলীর গঠনরীতি জয়দেবের, গানেরই মতো।

‘গীতগোবিন্দে’র ভাষা সংস্কৃত হলেও অন্ত্যানুপ্রাসযুক্ত অপভ্রংশ দ্বারা প্রবলভাবে প্রভাবিত। জয়দেবের কোন কোন পদে বাংলা পয়ার ও ত্রিপদীর আদিমতম রূপ আকস্মিকভাবে ধরা পড়েছে। যেমন—

“পততি পতত্রে বিচলিত পত্রে শঙ্কিত-ভবদুপযানম্।

রচয়তি শয়নং সচকিত নয়নং পশ্যতি তব পন্থানম্।।”

—এই পংক্তিকে সহজেই ত্রিপদীর আকারে পড়া যেতে পারে। এছাড়া বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস, বিদ্যাপতি, জ্ঞানদাস, গোবিন্দদাস এমনকি মাইকেল মধুসূদন— রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত জয়দেবের ভাবরসে সন্তরণ করেছেন।

উপরিউক্ত আলোচনা থেকে একথা প্রতীয়মান হয় যে, বাঙালির লেখা এই সমস্ত সংস্কৃত-প্রাকৃত-অপভ্রংশ ভাষায় রচিত সাহিত্য পরবর্তী বাংলা সাহিত্য থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। ভাষাগত ব্যবধান থাকলেও বাঙালির মনের ঋদ্ধতার প্রকাশ। জয়দেবের ‘গীতগোবিন্দে’র অন্ত্যানুপ্রাসের যে প্রকাশ দেখা যায়, পরবর্তীকালে বাংলা কবিতাতেও তার আভাস মেলে। প্রাচীন বাংলা লোক-প্রচলিত নাটগীতের আদর্শে গীতগোবিন্দের কাব্যরূপ, তারই নিশ্চিত অনুসরণ বড়ু চণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন। তাছাড়া ‘কবীন্দ্রবচনসমুচ্চয়’, ‘সদুক্তিকর্ণামৃত’-এ যে রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক শ্লোকগুলি পাওয়া যায় সেগুলিকে বৈষ্ণব পদাবলির পূর্বসূরি রূপে গ্রহণ করা চলে। সুতরাং বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বাঙালি রচিত সংস্কৃত-প্রাকৃত-অপভ্রংশ সাহিত্যের গুরুত্ব অনস্বীকার্য।

******************************************************************************************************************************************************************************************************************

join WhatsApp Youtube channel instagram

website facebook group facebook page

join telegram facebook profile

______________________________________________________________________________________________________________________________________________________

*****************************************************************************************************************************************************

EVERGREEN TUTORIAL STUDY CENTER

এভারগ্রীন টিউটোরিয়াল স্টাডি সেন্টার

WhatsApp – 8768868438

উন্নত মানের নোটস, অ্যাসাইনমেন্ট এবং সাজেশন এর একমাত্র নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান ।

আমাদের সেন্টার থেকে নোটস নিলে আপনারা 70 % থেকে 80 % এর মতো কমন পেয়ে যাবেন ।

অভিজ্ঞ শিক্ষক মন্ডলী তারা আমাদের সেন্টারের সমস্ত নোটস তৈরি করা হয়।

আমরা ছাত্র-ছাত্রীদের পাশে সবসময় থাকার চেষ্টা করি এবং সমস্ত রকম ভাবে সাহায্য করার চেষ্টা করি ।

আপনারা আমাদের সেন্টার থেকে নোটস কেন নেবেন?

  1. BEST QUALITY NOTES
  2. PERFECT SUGGESTIONS
  3. ONLINE CLASSES
  4. FULL SUPPORT & GUIDE
  5. LOW PRICE
  6. PRINTED NOTES & SUGGESTIONS
  7. SPEED POST HOME DELIVERY

 

কমন যোগ্য নোটস সাজেশন নিতে অবশ্যই আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করুন ।

EVERGREEN TUTORIAL STUDY CENTER

YOUR WAY TO SUCCESS

WhatsApp – 8768868438

*********************************************************************************************************

কেন আমাদের নির্বাচন করবেন ?

  • PDF Sample Copy দেখে নেওয়ার ব্যবস্থা আছে ।
  • DTP করা নোট থাকবে।
  • আমাদের নিজস্ব শিক্ষক,শিক্ষিকাদের দ্বারা বিভিন্ন রেফারেন্স বই ও নোট থেকে নোটস তৈরি করা হয় |
  • পরীক্ষার আগে লাস্ট মিনিট সাজেশান পেয়ে যাবেন।
  • সারাবছর সকল আপডেট ও সাহায্য পাবেন।
  • 70 – 80% কমন যোগ্য সাজেশান।
  • অনলাইন ক্লাসের ব্যাবস্থা।
  • By Post, Cash On Delivery (COD) Available
  • সমস্ত সেন্টারের থেকে কম মূল্যে উৎকৃষ্ট মানের নোটস ও অ্যাসাইনমেন্ট আমাদের সেন্টারেই পাবেন।

 

*******************************************************************************************************************************************************

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস,
BANGLA SAHITYER ITIHAS,

সংস্কৃত-প্রাকৃত-অপভ্রংশে রচিত বাঙালির সাহিত্যকর্মগুলির পরিচয় দিন,
BENGALI NOTES, BENGALI COLLEGE NOTES, BENGALI UNIVERSITY NOTES

Evergreen Tutorial

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *