আকবরের ধর্মনীতি আলোচনা করুন তিনি কি ইসলামকে ধ্বংস করেছিলেন?

উত্তর: বিভিন্ন মত ও ধর্মানুসরণের স্বাধীনতা ছিল, প্রাচীন ভারতের সনাতন আদর্শ। কিন্তু মধ্যযুগের মুসলমান শাসকগণ পরধর্মে সহিষ্ণু ছিলেন না। তারা হিন্দুদের উপর নানারূপ অত্যাচার চালিয়েছিল। তবে ব্যতিক্রমী শাসক ছিল শেরশাহ, আকবর। হিন্দুদের সঙ্গে সম্পর্ক ও ধর্মচিন্তার ক্ষেত্রে আকবর যে দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহন করেছিলেন তা সমকালীন আর কোন শাসকের মধ্যে প্রায় দেখা যায়নি। ধর্ম সম্পর্কে তিনি ছিলেন সকল প্রকার সংকীর্ণতার ঊর্দ্ধে। গতানুগতিক ধর্মবিশ্বাস যুক্তিহীন আচার অনুষ্ঠান ধর্মসূত্রে পাওয়া ধর্মীয় ঐতিহ্যকে দ্বিধাহীন চিত্তে লালন করার পরিবর্তে তিনি আন্তরিক ভাবে জানতে চেয়েছিলেন স্রষ্ঠাকে, সৃষ্টির সঙ্গে স্রষ্ঠার সম্পর্ক কি? নিরাকারকে তিনি দেখতে চেয়েছিলেন অন্তরের গভীর কল্পনার মধ্যে। আকরবরের এই ধর্মভাবনার চরম পরিণতি ঘটে ১৫৮১ খ্রীঃ দীন-ই-ইলাহী নামক একেশ্বরবাদি সমন্বয়ী ধর্মমত ঘোষণার মধ্যে। আবুল ফজলের মতে “He now is spritual guide of the nation.”

সর্বোপরি ধর্ম ও আধ্যাত্মিক বিষয়ে আলোচনার জন্য তিনি ১৫৭৫ খ্রীঃ ফতেপুর স্বীকৃতে ইবাদত খানা নামে একটি উপাসনা গৃহ স্থাপন করেন। হিন্দু দার্শনিক পুরুসত্তম দেবী জৈন ধর্মের হরি বিজয় সুরী ও ভানুচন্দ্র জেসুইট পাদরী রুদলক শিখগুরু ওমরদাস প্রমুখ পণ্ডিত ইবাদত খানায় আলোচনায় অংশ নিতেন। প্রকৃত পক্ষে ভিনসেন্ট স্মিথের ভাষায় বলা যায় ইবাদত খানা—“First world religious parlament”-এ পরিণত হয়। ইবাদত খানার ধর্মালোচনা থেকে আকবর উপলব্ধি করেছিলেন যে তত্তগত পার্থক্য থাকলেও প্রত্যেক ধর্মে কতগুলি মৌলিক সত্য রয়েছে এবং ঈশ্বরকে লাভ করাই সকল ধর্মের লক্ষ্য, এটা উপলব্ধি করেই আকবর ১৫৮১ খ্রীঃ একেশ্বরবাদী ধর্ম দীন-ই-ইলাহি প্রচার করেন। তাঁর সমালোচক বদাউনী এই ধর্মকে একটি নতুন ধর্ম বলে আখ্যা দেন এবং ভিনসেন্ট স্মিথ “Akbar the great mughal” গ্রন্থে এটিকে একটি নতুন ধর্ম এবং ইসলামের অস্বীকৃতি বলে ঘোষণা করেন।

দিনইলাহিন মূল বক্তব্য/বৈশিষ্ট্য : দীন-ই-ইলাহির মূল বক্তব্য ও বৈশিষ্ট আলোচনা করা বেশ কঠিন কেননা দীন-ই-ইলাহির দ্বারা আকবর কি বলেছেন তার কোন পূর্ণাঙ্গ বিবরণ নেই। এই ধর্মমতের কোন লিখিত গ্রন্থও নেই। আবুল ফজল বদাউনী এবং জেসুইট পাদরীদের লেখা থেকে যা কিছু জানা যায় তা থেকে এই ধর্মমত সম্পর্কে একটা ধারণা করা যেতে পারে।

প্রথমত : দীন-ই-ইলাহীর প্রথম যে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য চোখে পড়ে তা হল এই ধর্মমত সর্ব ধর্ম মর্তের একটি মিশ্রণ। আকবরের বক্তব্যে এই সমর্থন মেলে—“একই ধর্মে যা ভাল তা যেন হারাতে না হয়। সঙ্গে সঙ্গে অন্যটিতে যা ভাল তা যেন লাভ করা যায়।”

দ্বিতীয়ত : এই ধর্মমতে কোন দেবদেবী বা ঈশ্বর প্রেরিত পুরুষের স্থান ছিল না। সম্রাট আকবরই ছিলেন পীর বা গুরু। এই মতবাদের ধর্মানুসরণের জন্য চারটি মার্গের কথা বলা হয়েছে। সম্পত্তি ত্যাগ, অহং ত্যাগ, মাশ্চর্য ত্যাগ, গোড়ামি ত্যাগ। এই ধর্মাবলম্বীদের পালনীয় কর্তব্য সমন্ধে বলা হয়েছে যে গোমাংস তথা আমিশ ভোজন থেকে বিরত থাকা পরস্পরকে ভোজ দ্বারা আপ্যায়িত করা দীন দরিদ্র-কে সাধ্যতানুযায়ী সেবা করা ইত্যাদি।

তৃতীয়ত : দীন-ই-ইলাহির নিজস্ব অনুষ্ঠান ও আচার বিচার ছিল। যেহেতু সম্রাট ছিলেন এই ধর্মমতের গুরু তাই এই ধর্ম গ্রহন ছিল সম্রাটের অনুমতের সাপেক্ষ। কেউ এই ধর্মমত গ্রহন করতে চাইলে প্রথমে এই ধর্মমতের প্রধান পুরোহিত আবুল ফজলের স্বীকৃতি লাভ করতে হত।

চতুর্থত : ধর্মের ছাপ থাকলেও দীন-ই-ইলাহি ছিল একটি রাজনৈতিক দলিল এতে কতগুলি বিশিষ্ঠ রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নীতির সমন্বয় করা হয়েছিল।

নতুন ধর্মমত : দীন-ই-ইলাহি একটি নতুন ধর্ম কিনা তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আছে। আকবরের দীন-ই-ইলাহী একটি নতুন ধর্ম এবং এই ধর্মে তিনি ইসলামকে পরিত্যাগ করেছিলেন। বদাউনী দেখিয়েছেন যে দীন-ই-ইলাহিতে আকবর এমন কিছু নিয়ম কানুন প্রচলন করেছিলেন যা ইসলাম ধর্ম সম্মত ছিল না। যেমন সাপ্তাহিক নামাজ গোমাংস ভক্ষণ, নতুন মসজিদ নির্মাণ, মক্কা তীর্থযাত্রা প্রভৃতি নিষিদ্ধ করেন। এই ধর্মে যোগদান করতে হলে সম্রাটের অনুমতি নিতে হত। বদাউনীর মতে দীন-ই-ইলাহিত মূল কথা ছিল সম্রাটের পূজা এবং আল্লাহুর পরিবর্তে জীবন সম্মান ধর্মও সম্পত্তি সমর্পণ করা হয় সম্রাটের হাতে। বদাউনীর তথ্যের উপর নির্ভর করে ড. ভিনসেন্ট স্মিথ ‘দীন-ই-ইলাহি’ আকবরের জ্ঞানের পরিচয় নয়, নির্বুদ্ধিতার চরম নির্দশন এবং সম্রাটের অহংরোধ ও অনিয়ন্ত্রিত স্বৈরচারিতার জলন্ত দৃষ্টান্ত বলে নিন্দাবাদ করেছেন।

মতের খন্ডন : আধুনিক ঐতিহাসিকগণ মনে করেন যে দ্বীন-ইলাহী আদৌ কোন নতুন ধর্ম নয় এবং আকবর তার ধর্মচিন্তায় ইসলামকে পরিত্যাগ করেননি। দীন-ই-ইলাহিকে সুফীবাদের প্রভাবে প্রভাবিত একটি উদার মত বলা চলে। কিন্তু তা আলাদা ধর্ম নয়। আলাদা ধর্ম হলে আলাদা ধর্মগ্রন্থ উপাসনার গৃহ বা দেবদেবীর প্রয়োজন কিন্তু আকবরের প্রবর্তিত ধর্মে এইসব কিছুই ছিল না। সুতরাং এটিকে আলাদা ধর্মমত বলা যায় না।

পর্যালোচনা : আকবরের দীন-ই-ইলাহি কোন নতুন ধর্মমত ছিল না বা ইসলামের অস্বীকৃতও নয়, কখনই তিনি ইসলাম ধর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন হননি। সমগ্র ভারতবর্ষ ব্যাপি অখণ্ড সাম্রাজ্য এবং এক অখণ্ড সংস্কৃতি স্থাপনের জন্য তিনি ধর্মীয় উদারতাকে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। ষোড়শ শতকের শ্রেষ্ঠ শাসকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন ইংল্যান্ডের রাণী এলিজাবেথ, ফ্রান্সের রাজা চতুর্থ হেনরি এবং পারস্যের প্রথম আব্বাস কিন্তু সর্বক্ষেত্রে কৃতিত্বের দিক দিয়ে বিবেচনা করলে আকবরের কাছে অন্যানরা ম্লান হয়ে যায়। তাঁর মহত্ব ধর্মীয় চিন্তা চিরকালের জন্য তাকে মানবজাতির একজন শ্রেষ্ঠতম কল্যানকামী রূপে ইতিহাসে তাঁকে অমর করে রাখবে।

**********************************************************************************************************************************************************************************************************************************

 

join WhatsApp Youtube channel instagram

website facebook group facebook page

join telegram

 

********************************************************************************************************************************************************************************************************************************************

 

Akbar religious policy, Din i Ilahi, Sulh i Kul, Akbar Islam debate, Mughal history Akbar, আকবরের ধর্মনীতি, আকবর কি ইসলাম ধ্বংস করেছিলেন, Akbar exam notes, Mughal empire religion

আকবরের ধর্মনীতি, আকবর কি ইসলাম ধ্বংস করেছিলেন, আকবরের দীন-ই-ইলাহী, সুলহ-ই-কুল নীতি, মুঘল সম্রাট আকবর ধর্মনীতি, আকবরের ধর্মীয় সহনশীলতা

আকবরের ধর্মনীতি আলোচনা করুন। তিনি কি ইসলামকে ধ্বংস করেছিলেন?

আকবরের ধর্মনীতি আলোচনা করুন। তিনি কি ইসলামকে ধ্বংস করেছিলেন?

Evergreen Tutorial

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *